প্রফেশনালিজম কি?

যেকোন কাজের’ই একটা বেস্ট প্র্যাকটিস থাকে, সেটা হোক মাটি কাটা অথবা প্লেন চালানো। এর মানে আবার এটা না যে প্রফেশনালভাবে কাজ ডেলিভারি করতে হলে আপনাকে বেস্ট’ই হতে হবে। কাজ কমপ্লিট করার ক্ষেত্রে যথাযথ সবগুলো ধাপ ঠিকঠাক মতো বা ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী করে দেয়াটাকেই সহজ ভাষায় প্রফেশনালিজম বলা যায়। এর সাথে আরও কিছু আনুষঙ্গিক ব্যপার রয়েছে। যেমন কাজটি ডেলিভারির ক্ষেত্রে যদি আপনাকে সরাসরি ক্লায়েন্ট এর সাথে ডিল করতে হয় সেক্ষেত্রে সৌজন্যমূলক আচরন করা, অথবা ইমেইল এ যথাযথ এটিকেট মেনে যোগাযোগ রক্ষা করা।

বাস্তব উদাহরণ

আমি আমার বাস্তব জীবনের প্রফেশন দিয়েই একটি উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করছি এখানে। পেশাগতভাবে আমি একজন ফ্রিল্যান্স ওয়েব ডেভেলপার। আর এজন্যে অনেক সময়ই অনেক ক্লায়েন্টকে হ্যান্ডেল করতে হয়। ফ্রিল্যান্সিং প্লাটফর্ম (যেমনঃ আপওয়ার্ক) এ কাজের জন্য বিড করার পাশা-পাশি ইনভাইটের রিপ্লাই এ নিজের পেশাগত স্কিল এর পাশাপাশি প্রফেশনাল এটিচ্যুড অনেক ক্ষেত্রেই অনেক কাজ পেতে আমাকে সাহায্য করেছে। এটা যে শুধু ইন্টারন্যাশনাল প্লাটফর্ম এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সেটা নয়, লোকাল অনেক কাজেও সেটা হেল্প করেছে।

আপওয়ার্ক এ কানাডার এক ক্লায়েন্ট এর কাছে থেকে ইনভাইট পেলাম একবার। তাদের একটা সাইট রি-ডিজাইন করার জন্য সে ইনভাইট দিয়েছিলো। তো সেখানে যে যে কাজগুলো আমি করেছিলাম তা নিচে পয়েন্ট আকারে দিচ্ছি

১. আমি তার দেয়া কাজের পূর্ণ বিবরণ ২-৩ বার পরলাম।

২. সে কি কি চেয়েছে তার প্রত্যেকটি পয়েন্ট ভালমত পরলাম। প্রয়োজনে নোট নিন।

৩. তার বর্তমান সাইট দেখলাম, সেখানের সমস্যাগুলো বেড় করার চেষ্টা করলাম।

৪. তার নতুন সাইটে সে কি কি এক্সট্রা ফিচার চেয়েছে সেগুলো নিয়ে একটু গবেষণা করলাম।

৫. তার চাওয়া সবকিছু কি আমার স্কিলের সাথে ম্যাচ করে কিনা সেটা আবারো ক্রস চেক করলাম।

৬. প্রজেক্ট নিয়ে আমার কি কি প্রশ্ন আছে সেগুলো লিখে ফেললাম।

৭. কাজটি করতে ঘন্টা প্রতি পারিশ্রমিক কত নেবো সেটা জানালাম। তখন আমি আমার রেগুলার ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে আমি যে পেমেন্ট নিতাম তার দেড়গুণ পেমেন্ট আমি তার কাজের জন্য বিড করলাম। কারন একটাই, পুরো বিবরন পরে আমার মনে হয়েছে যে কাজটি আমি বেশ ভালোভাবে প্রফেশনালভাবে করতে পারবো।

৮. ক্লায়েন্ট স্কাইপ এ কথা বলার শিডিউল জানতে চেয়েছিলো, তাকে সময় জানালাম এবং কাজে বিড করলাম।

৯. এবার অপেক্ষা।

বিড এর কভার লেটারে কি কি দিয়েছিলাম এবং কিভাবে দিয়েছিলাম

 

কভার লেটারে আমি যে যে বিষয়গুলো রেখেছিলামঃ

১. প্রথমেই গ্রিটিংস দিয়ে শুরু করেছিলাম এবং আপনারাও সেটাই করবেন। এক্ষেত্রে Dear XX (ক্লায়েন্টের নাম), অথবা Hello XX দিয়ে শুরু করতে পারেন। Sir, Boss ইত্যাদি বলার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।

২. আমি ইনভাইটেশনের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে শুরু করি। ক্লায়েন্টের যদি প্রথম কাজ হয় বা কোন স্টারট-আপ বা নিউ প্রজেক্ট হয় সেক্ষেত্রে  ছোট একটা কনগ্রাচুলেশন দেই। তারপর সরাসরি পয়েন্টে চলে যাই। তার লেখা প্রজেক্ট বিস্তারিত পুরোটা পরেছি সেটা বলি মাঝে মাঝে।

৩. সমস্যা এবং কিভাবে সমাধান করবো সেটার বিস্তারিত বলি। প্রজেক্টটাকে কিভাবে ভাগ করে কাজ করবো সেটা নিয়ে কিছু থাকলে সেটা বলি।

৪. প্রজেক্ট নিয়ে আমার প্রশ্নগুলো লিখি।

৫. গ্রিটিংস দিয়ে শেষ করি এবং আমার কাছে যেকোন প্রশ্ন থাকলে সেটা যেন কোন দ্বিধা ছাড়াই সে জানতে চায় সেটা বলি।

৬. আমি সাধারনত নিজের স্কিল নিয়ে কিছু বলিনা, কারন সেটা যেকোন ক্লায়েন্ট আমার প্রোফাইলে গিয়ে ইজিলি দেখতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ফ্রিল্যান্সারের নিজের গুণগান পরতে ক্লায়েন্ট পছন্ট করেনা।

৭. ক্লায়েন্ট যদি আমার স্পেসিফিক কোন স্কিল নিয়ে জানতে চায় তাহলে সেটা বলি।

মোটামুটি এগুলো দিয়েই আমি সাবমিট করি।

ক্লায়েন্ট কি রিপ্লাই দিলো এবং স্কাইপে কিভাবে কথা হলো

 

আমার প্রোফাইল ক্লায়েন্ট আগেই দেখেছিলো তাই সে আমার স্কিল নিয়ে খুব একটা প্রশ্ন করেনি। সে বেশ কিছু সাজেশন চেয়েছিলো, যেমন কি ধরনের থিম বা এক্সটেনশন তার সাইটের জন্য ভাল হবে। সাইটটা পুরোটা ফ্রেঞ্চ ভাষায় হবে এবং সেটা পুরোপুরি কিভাবে করা যেতে পারে এ ধরনের কিছু কথা হয়।

ফাইনালি যে ব্যপারটা মূল মানে পেমেন্ট সেটা নিয়ে কথা হয়। সে আমাকে আমার হাওয়ারলি রেট কিছুটা কমানোর জন্য রিকোয়েস্ট করে যেটা আমি খুব ভদ্রভাবে এবং কোন দ্বিধা ছাড়াই না করে দেই। সেক্ষেত্রে সে আমার আগের কিছু কাজের রেফারেন্স টেনে বলে তুমিতো অন্য ক্লায়েন্টের জন্য এর চেয়ে কমেও কাজ করো। আমি জানাই অন্য ক্লায়েন্টগুলো সাধারনত আমাকে ১০০ বা তার চেয়ে বেশী ঘন্টার জন্য হায়ার করে যার জন্য আমি ছাড় দিতে পারি, তুমিও আমাকে ১০০+ ঘন্টার জন্য হায়ার করো আমিও তোমাকে ছাড় দিবো।

পুরো কনভারসেশনে আমার টোন ছিলো ফ্রেন্ডলি। কখনোই আবেগে আপ্লূত হবেন না বা তেল দেয়ার চেষ্টা করবেন না। আর কাজ পাওয়ার জন্য ধরাকে সরা মানে নিজের স্কিলের বাইরের জিনিস’ও করে দিতে পারবেন এমনটা কখনোই বলবেন না।

ক্লায়েণ্ট আমার কাছ থেকে একদিন সময় চেয়ে নেয়। সে এটাও জানায় আমার চেয়ে কম রেটে আরো দুইজনের সাথে তার কথা হয়েছে।

 

এভাবে ২-৩ দিন যায় এবং ক্লায়েন্ট আমাকে অফার দেয় কাজের জন্য এবং আমার দেয়া রেটেই।

কি পয়েন্টস

 

পুরো কাজের ক্ষেত্রে যে যে বিষয়গুলো প্রফেশনাল হওয়াতে আমি কাজটি পেলাম, আমার চেয়ে কম রেটে যোগ্য প্রার্থী থাকার পরেওঃ

১. পুরো প্রজেক্টের সমস্যা এবং সমধান কিভাবে হবে তার ওভারভিউ সুন্দরমত দেয়া।

২. টাইমফ্রেম দেয়া।

৩. সব কিছুতেই ক্লায়েন্টের মতামতের উপর নির্ভর না করে, ভাল কনসালটেন্টের মত ক্লায়েন্টকে প্রজেক্টের বিভিন্ন ব্যপারে সাজেস্ট করা।

৪. প্রতিটি ধাপ প্রফেশনালভাবে সিরিয়াসলি শেষ করা।

৫. কথা বলায় এবং লেখায় কনফিডেন্স ধরে রাখা (ওভার কনফিডেন্ট হয়ে যাবেন না আবার)।

৬. নিজের মতামতকে গুরুত্ব দেয়া।

৭. ক্লায়েন্টের দেয়া ইনপুট গুরুত্ব সহকারে শোনা এবং সে ব্যপারে মতামত দেয়া। ক্লায়েন্টের ভুল থাকলে সেটা সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেয়া।

৮. আস্থার একটা জায়গা তৈরি করা যেন, ক্লায়েন্ট আপনাকে কাজ দিয়ে কিছুটা রিলাক্স করতে পারে।

৯. যতক্ষণ পর্যন্ত ক্লায়েন্ট কোন ব্যপারে ক্লিয়ার হতে না পারবে সেটা ক্লিয়ার করে দেয়ার চেষ্টা করা।


কেমন হলো জানাবেন। ভাল লাগলে শেয়ার করতে পারেন বন্ধুদের সাথে।  কোণ প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট সেকশনে জানাতে পারেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

Comments
Kazi Mamun

Kazi Mamun

আমি কাজী মামুন, পেশায় ওয়েব ডেভেলপার। ইউ.আই. ইউ.এক্স এবং ওয়ার্ডপ্রেস নিয়েই কাজ করা হয়। এর বাইরে নতুন নতুন গ্যাজেট নিয়ে ঘাটা-ঘাটি করতে ভাল লাগে। টেকনোলজি নিয়ে টুকটাক লেখালেখি, মাঝে মাঝে ইউটিউব ভিডিও বা পডকাস্ট করতে ভাল লাগে।

4 Comments

আপনার মতামত দিন...